বিশেষ প্রতিনিধি: সুমন নূর

ঘুষ হারাম হলেও হিকমত তরফদারের কাছে তেমন পাপের কাজ না। কাজ করে দিবেন, সুবিধা নেবেন। ন্যায্য পাওনা। এটা হারামের কী আছে? এমন প্রশ্ন প্রকাশ্যে না করলেও মনে মনে বহুবার করেছেন। গত দুই সপ্তাহ ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের ফাইল আঁটকে রেখেছেন তিনি। ওয়ালিউল্লাহ সাহেব একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। বেচারা বহুদিন অফিসের বারান্দায় বসে থাকেন। ঘন্টার পর ঘন্টা। কী-ইবা করবেন। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবস্থা বৃদ্ধ সিংহের মতো। তর্জন গর্জনের কৌশল জানা থাকলেও শক্তি থাকে না।

হিকমত তরফদার জানালার ফাঁক দিয়ে ওয়ালিউল্লাহ সাহেবকে দেখলেন। চেয়ার ঠেলে বারান্দায় গিয়ে কাঁধে হাত রাখলেন।
মাস্টার মশাই, বাসায় সময় কাটে না? প্রতিদিন এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকেন।
স্যার। অবসর ভাতাটা আমার খুব প্রয়োজন। ফাইলটা কিছুতেই ছাড় হচ্ছে না।
হবে কেমনে? পয়সা কী গাঁটে গুঁজে রাখার জিনিস?
বুঝলাম না ব্যাপারটা!
বুঝবেন কেমনে? সারাজীবন প্রাইমারিতে কাটিয়েছেন!
ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের আত্নসম্মানে খুব লাগলো! ত্রানবোর্ডে হেড ক্লার্কের চাকুরির অফার পেয়েছিলেন। সেখানে বাড়তি উপার্জনের সুযোগ ছিলো। ত্রানবোর্ডে চাকুরী করলে শেষ বয়সে এসে এসব ভাতা টাতার প্রয়োজন পড়তো না। সেদিকে না গিয়ে স্কুলে মাস্টারিকেই সন্মানজনক পেশা ভেবেছিলেন ওয়ালিউল্লা সাহেব।
হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। তিনটে পয়ত্রিশ। যোহরের নামাজ এখনো হয়নি।

হিকমত তরফদার গলায় খাকাড়ি দিলেন।
একটা কথা বলি?
জী বলুন।
কিছু মালপানি ছাড়েন। তাহলে আর কষ্ট করে আসতে হবে না। আপনার ভাতা পায়ে হেঁটে বাড়ি যাবে।

ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের চোখের উপর ভেসে উঠলো, ডাকপিয়ন তার বাড়ির উঠোনে গিয়ে ডাকছেন।
স্যার, বাড়িতে আছেন। স্যার?
রোমেনার মা জানালা খুলে জানতে চাইলেন, কী গো? মাস্টারকে দিয়ে কাজ কী?
ডাকপিয়ন বললেন, স্যারের অবসর ভাতার টাকা এসেছে।
রোমেনার মা দ্রুতপায়ে দৌঁড়ে এলেন। কত টাকা?
নয় লক্ষ পয়ষট্টি হাজার সাতশত বারো টাকা মাত্র!
শুনেছিলাম দশলাখ পাবে। এতো কম কেন?
সেটা জানি না।
আচ্ছা সত্তর হাজার পুরো করা যায় না?
না গো কাকী, সরকারি হিসেব। করার কিচ্ছু নেই।

ওয়ালিউল্লাহ মাস্টার বাড়ির বাইরে এলেন।

স্যার, স্বাক্ষর করেন। ওয়ালিউল্লাহ সাহেব মোট ছয় জায়গায় সাইন করলেন। পোষ্টমাস্টার টাকাভর্তি ব্যাগ দিয়ে বললেন, স্যার গুনে নেন। দেখেন ঠিক আছে কীনা!

ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের চোখ চকচক করে উঠলো। এতো টাকা তিনি এই প্রথম দেখলেন। সারাজীবন মাসের বেতন মাসেই খরচ হয়ে যেতো। শুধু স্বপ্ন দেখেছেন, রিটায়ার করলে অনেকটাকা একসাথে পাবেন। যাক, টাকাগুলোতে বাকী জীবন ভালোই কাটবে।

কী মাস্টার মশাই, কিছুই বললেন না?
ওয়ালিউল্লাহ সাহেব নড়ে উঠলেন।
ওহ, আচ্ছা।
কীসের আচ্ছা? ভেবে দেখেন। রাজি হলে যোগাযোগ করবেন। নইলে প্রতিদিন প্যারেড করতে করতে অফিসে আসবেন আর বারান্দায় বসে থাকবেন। ভাতা আর পাবেন না। মৃত্যুর পর আপনার স্ত্রী অবশ্য পাবে। তখন আরও ঝামেলা। বুঝেনই তো।
তা, কত টাকা দিতে হবে?
টাকা বেশী লাগবে না। দ্রুত কাজ করতে চাইলে বেশী লাগবে। বুঝেনই তো। আপনি মুরুব্বি মানুষ। তারপর আবার শিক্ষক। শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষক মেরুদণ্ডের ক্যালসিয়াম।
ওয়ালিউল্লাহ সাহেব মনে মনে হাসলেন। শিক্ষকদের কত সমাদর।
আমার হাতে সময় কম। তাই বলছিলাম, ফাইনাল কথা বলবেন কী না?
জী বলেন।
আমার উপরে একজন আছেন। উনি আমার বস। খুবই ভালো মানুষ। টাকা পয়সার প্রতি লোভ তেমন নেই। উনাকে হাজার ত্রিশেক দিলেই হবে। আর আমার জন্য হাজার বিশেক। এইতো। মোট পঞ্চাশ হাজার।

ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের কপালের ঘাম বড় হতে থাকে। পঞ্চাশ হাজার টাকা! কিভাবে ব্যাবস্থা করবেন?
হিকমত তরফদার আবারও স্মরণ করিয়ে দিলেন, পঞ্চাশ হাজার খুবই সামান্য টাকা। দেখেন যতোদ্রুত ম্যানেজ করবেন ততোই মঙ্গল।

ওয়ালিউল্লাহ সাহেব বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। উপজেলা সদর থেকে প্রথমে ভ্যানগাড়িতে। এরপর পায়ে হেঁটে তিন কিলো। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কিছুদূর হেঁটে জিরিয়ে নেন। ব্যাক্তিজীবনে ওয়ালিউল্লাহ মাস্টার নিঃসন্তান ছিলেন। সম্পদ বলতে বিঘাখানেক ধানিজমি। শেষ পর্যন্ত সেটা বন্ধক রাখলেন।

হিকমত তরফদার মুচকি হেসে বললেন, আপনার ফাইলটা আজকেই রেডি করে ফেলবো। চার পাঁচদিন পর এসে খোঁজ নিবেন। ওয়ালিউল্লাহ সাহেব সপ্তাহবাদে এলেন। এসে শুনলেন, হিকমত তরফদার বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। গা ঘামতে শুরু করলো। এখন কী হবে তার? রাগে, দুঃখে শরীর কাঁপতে থাকে। কাউকে কিছু বলতে পারেন না। বাড়ির পথে পা বাড়ালেন।

কয়েকবছর পর হিকমত তরফদার কঠিন রোগে আক্রান্ত হলো। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। কৃতকর্মের সব একে একে ভেসে উঠতে থাকে। ওয়ালিউল্লাহ মাস্টার যেনো তার সামনে বসে আছেন।
স্যার, আমার অবসরের টাকাটা? স্যার, টাকাটা আমার খুব প্রয়োজন। হিকমত তরফদার জীবনের শেষ ইচ্ছে হিসেবে ওয়ালিউল্লাহ মাস্টারের খোঁজ করতে পাঠালেন।

জানা গেলো, দুবছর আগে উপজেলা সদর থেকে ফেরার পথে ওয়ালিউল্লাহ মাস্টার স্ট্রোক করেছিলেন। হস্পিটালের নেয়ার পথে মারা যান।