লেখক: সু ম ন নূ র

ফুটপাতে আচার বিক্রি করে দুই ভাই। বয়স ১৪-১৫ হবে। দোকানের নাম দিয়েছে ‘ভাই ভাই আচার’। নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিতেই সোজাসাপটা উত্তর- ভাই ভাই এর চেয়ে সুন্দর নাম দুনিয়ায় নাই। দোয়া করবেন আমরা যেনো একদিন বড়ো কোম্পানির মালিক হতে পারি। ফুডপান্ডাসহ বেশকিছু অনলাইনে তাদের প্রোডাক্ট চলছে বলে আনন্দের সাথে দেখালো।

তেজগাঁও রেলগেটে বিড়ি সিগারেট বিক্রি করে বেলাল। বাড়ি ময়মনসিংহ, বয়স এখনো দশ হয়নি। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা, খরচবাদে শুধুমাত্র লাভ থাকে পাঁচশো টাকা। তারমানে ফুটপাতে গলায় দোকান ঝুলানো সিগারেট বিক্রেতা বেলালের মাসিক আয় প্রায় পনেরো হাজার টাকা। বড়ো হয়ে সে বড়ো ব্যবসায়ী হবার স্বপ্ন দেখে।

স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাইভা দিয়ে ফোনের অপেক্ষায় রয়েছে। অফিস থেকে জানিয়েছে, নয় হাজার টাকা বেতন দেবে। প্রায় কুড়িটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিয়েও স্যালারি পছন্দ হয়নি। গাড়ি ভাড়াটাই গচ্চা যায় প্রতিবার। পনেরো হাজার টাকা হলেও হোক, তবুও চাকুরী প্রয়োজন ছেলেটার।

চাকুরির বাজার এবং বর্তমান বাস্তবতা অনেক কঠিন। তারমানে এই নয়- আজ থেকে ফুটপাতে আচার বিক্রি শুরু করতে হবে অথবা গলায় গামছা ঝুলিয়ে চা, পান, বিড়ি, সিগারেট! কলেজ, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া কেউ চাইলেই যেমন চা-স্টল দিতে পারে না, আবার রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাঁস পালন করে সফলতা অর্জন করতে পারবে না। পারলেও সমাজ তাদের সহজে মেনে নেয় না। সমাজকে মানাতে হলে নিজের অবস্থান এবং অর্জিত জ্ঞান দুটোর সমন্বয় করেই অর্থ উপার্জন করতে হয়।
.
সরকারি চাকুরী মানে আলাদিনের চেরাগ। ঘষা দিলেই শুধু টাকা আর টাকা। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে টেক্সাইল ইঞ্জিনিয়ারিং করা একজন বায়িং হাউজে জব করে। শুক্রবার অফিস সহায়ক পদে পরীক্ষা দিচ্ছে। মর্যাদার দিক থেকে এটা যায়? বুঝেনই তো সরকারি চাকুরী। পিয়ন-টিয়ন যাই হোক, একবার হলে আর কিছু লাগে না। রাতারাতি প্লট, ফ্ল্যাট, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়তে থাকে। প্রশ্ন করলে বুক ফুলিয়ে উত্তর দেয়, অমুক মন্ত্রণালয় বা তমুক জায়গায় আছি। যদি বলা হয়- কি হিসেবে আছেন? তখন সুন্দর মুখটা হঠাৎ কালো হয়ে যায়। অথচ একটু আগেই বলছিলেন- চাকুরী করে কী কী করেছেন, কতটাকার মালিক হয়েছেন।

এনটিআরসি সিস্টেমের পূর্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের প্রায় সিংহভাগ মানুষ ঘুষ দিয়ে চাকুরী নিয়েছে। এখনো নিচ্ছে। কথা সেটা নয়, কথা হলো- ঘুষ দিয়ে চাকুরী নেয়া, ক্লাসে নীতিকথা বলা মানুষটার কতদিন পর থেকে উপার্জন হালাল হবে? দশ বছর, পনেরো বছর নাকি পুরোজীবনের উপার্জনই হারাম?

বেশীকিছু ভাবতে পারি না। লিখতে পারি না। মনে হয় এসব কেউ পড়বে না। পড়লে গালি দেবে। মিথ্যে লিখে বাহবা পাওয়ার চেয়ে সত্য লিখে গালি খাওয়া ভালো।

সুমন নূর বলেন অন্তত একজন মানুষও যদি লেখাগুলো উপলব্ধি করে, বিবেকে নাড়া দেয়- সেটাই আমার স্বার্থকতা।