বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা ! বর্তমানে রোজা-ঈদ পালনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে দুই ধরনের ফতোয়া শোনা যাচ্ছে।
”
এক. আমরা বলি, নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখে রোজা-ঈদ পালন করা আবশ্যক ।
দুই. আবার কেউ কেউ বলেন, সৌদি আরব অথবা বিশ্বের যে দেশে আগে চাঁদ দেখা যাবে, সে দেশের সংবাদের ভিত্তিতে রোজা-ঈদ পালন করা আবশ্যক।
দুই ফতোয়ার ক্ষতি
এ দুই ফতোয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে, আমাদের দৃষ্টিতে তারা গুনাহ্গার, তাদের দৃষ্টিতে আমরা গুনাগার, গড়ে সবাই গুনাগার। কেননা, যখন সৌদি কিংবা অন্য কোনো দেশে চাঁদ উঠার সংবাদ পাওয়া যায় তখন তারা এ দেশে রোজা শুরু করে; কিন্তু আমরা রোজা শুরু করি না । তাই তারা মনে করে আমরা রোজা বর্জন করে কবিরা গুনাহ করছি। অপর দিকে আমরা মনে করি, আমাদের দেশে চাঁদ উঠার আগেই রোজা শুরু করার কারণে তারা গুনাগার হচ্ছে।
ঠিক তেমনিভাবে, রমজানের শেষেও উভয় দল গুনাহ্গার । কেননা, যখন কোনো দেশের চাঁদের সংবাদ আসে তখন তারা ঈদ করে; কিন্তু আমরা ঈদ করি না । আমরা মনে করি, তারা রোজার দিনে ঈদ করছে, যার কারণে তারা কবিরা গুনাহ করছে। আর তারা মনে করে, আমরা ঈদের দিনে রোজা রাখছি, ফলে আমরা কবিরা গুনাহ করছি ।
আর তাদের দৃষ্টিতে আমাদের কুরবানী সহীহ হলেও আমাদের দৃষ্টিতে তাদের কুরবানী সহীহ হয় না। কেননা, তারা আমাদের হিসেবে জিলহজ্জের ৯ তারিখে আর আমরা তাদের হিসেবে ১১ তারিখে কুরবানী করি I কোন ফতোয়া সঠিক ?
উভয় দলের ফতোয়া ও কর্ম একই দেশে, একই মুহূর্তে কিভাবে সঠিক হতে পারে? তাহলে একই দিনে একই দেশে রোজা ও ঈদ একত্রে হওয়া আবশ্যক হয়ে যাবে, যা কখনই সম্ভব নয় । এমন অসম্ভব বিষয় হওয়া সত্ত্বেও উভয় দল নিজেদেরকে হক ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন বলে বিশ্বাস করেন। দলিল হিসেবে উভয় দল একই আয়াত ও হাদীস পেশ করে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা করে থাকেন। সাধারণ মুসলমানদের দলিল
রোজা-ঈদ পালনে বিভ্রান্তির নিরসন ৩
যাচাইয়ের ক্ষমতা না থাকায় তারা চরম বিভ্রান্তিতে পতিত হচ্ছেন। আর বলে বেড়াচ্ছেন-
এই হুজুর বলে এই কথা, ঐ হুজুর বলে ঐ কথা, আমরা মানবো কার কথা ??
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা!
হতাশ হবেন না । বিভ্রান্ত হবেন না। সত্যের মাঝে কখনই হতাশা ও বিভ্রান্তি নেই । সত্যে আছে প্রশান্তি । সুতরাং রোজা-ঈদ পালনের বিষয়ে হতাশা এবং বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে, সত্য ও সঠিক পথ পেতে আমরা কুরআন-সুন্নাহ ও বিজ্ঞানের আলোকে, একটি নকশা অংকন করেছি। আপনি যদি ভালোভাবে এ নকশা বুঝে নিতে পারেন, তাহলে আপনিও বুঝবেন কোন্ ফতোয়া সঠিক । আপনার মনে আর কোনো সন্দেহ সংশয় থাকবে না এবং আপনার অন্তর প্রশান্ত হবেই ইনশাআল্লাহ । নকশা বুঝার পূর্বে আমাদের যে সকল কথা মনে রাখতে হবে- এক. রোজা-ঈদ পালনের মূলনীতি কী ?
”
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে সে যেন এই মাসে অবশ্যই রোজা রাখে।” (সূরা- বাকারা, আয়াত- ১৮৫)
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- “তোমরা নতুন চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং নতুন চাঁদ দেখে রোজা ছাড়ো। যদি মেঘ ইত্যাদির কারণে চাঁদ দেখা না যায় তাহলে শাবান মাসকে ৩০ দিনে (সহীহ বুখারী, হাদীস- ১৯০৯)
কর।
তাহলে বুঝা গেল রোজা-ঈদ পালনের মূলনীতি হচ্ছে চাঁদ দেখে রোজা রাখা এবং চাঁদ দেখে ঈদ করা। আর সেই সাথে যদি চাঁদ না দেখা যায়, তাহলে কী করতে হবে, তাও এ হাদীসে বলে দেওয়া হয়েছে। দুই. নতুন চাঁদ কখন কিভাবে দেখা যায়?
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আর ইবাদতের সময় চেনার জন্য সূর্য ও চন্দ্রকে ঘড়ি হিসেবে দান করেছেন। উভয়টির ঘূর্ণনের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তে থাকি না কেন, সময় বুঝে সকল ইবাদত করতে পারি। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন- “তিনি সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। সবাই আপন আপন কক্ষপতে বিচরণ করে।” (সূরা- আম্বিয়া, আয়াত- ৩৩)
এ আয়াত দ্বারা যা বুঝা যায়
এক. সূর্য, চন্দ্র, দিন ও রাত সবাই আপন আপন কক্ষপথে ঘুরে । দুই. আর তাদের সকলের কক্ষপথ পূর্ব থেকে পশ্চিম ।
তিন. সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠে পশ্চিম দিকে ডুবে । এটা তো সকলেই দেখে; কিন্তু চাঁদ কোন দিক থেকে উঠে কোন দিকে ডুবে, তা সকলে জানে না ।
চার. আসলে চাঁদও পূর্ব দিক থেকে উঠে পশ্চিম দিকে ডুবে। অর্থাৎ চাঁদের গতিও পূর্ব থেকে পশ্চিম
# প্রথম দলিল
মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “শপথ চন্দ্রের যখন তা সূর্যের পিছনে পিছনে চলে।” (সূরা- শামস, আয়াত- ২)
# দ্বিতীয় দলিল
মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- “তিনি দুই উদয়স্থলের রব এবং দুই আস্থাচলের রব ।” (সূরা- রহমান, আয়াত- ১৭)
অর্থাৎ মহান আল্লাহ তাআলা সূর্য এবং চন্দ্র উভয়ের উদয়স্থলের প্রভু এবং তিনি উভয়ের আস্থাচলেরও প্রভু । (সফওয়াতুত তাফসীর, খন্ড- ৩, পৃষ্ঠা-২৭৭) # তৃতীয় দলিল
আমরা যখন নতুন চাঁদকে পশ্চিম দিকে উঠতে দেখি, তখন কি চাঁদ উপরের দিকে যায়, না আস্তে আস্তে নিচের দিকে যায় ?
নিচের দিকে যায়।
তাহলে বুঝা গেল চাঁদ পশ্চিম দিকেই যাচ্ছে।
অমাবশ্যার পর নতুন চাঁদ এক স্থানে দৃশ্যমান হওয়ার পর পশ্চিম দিকে যেতে থাকে এবং দৃশ্যমান হতে থাকে। আর পূর্বাঞ্চলের মানুষেরা তাকে ডুবতে দেখে। অথচ চাঁদ পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলছে । পশ্চিমের দেশ সমূহের লোকেরা স্বাভাবিক ভাবেই নিজ নিজ সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখতে পান। এভাবেই ২৪ ঘণ্টার ভিতরে পূর্ণ পৃথিবীর মানুষ
নতুন চাঁদ দেখতে পান। সমগ্র পৃথিবীর মানুষ মাসের শুরুতে নতুন চাঁদকে সন্ধ্যা বেলায় ডুবার সময় দেখতে পায় ।
চাঁদ ডুবার সময় দেখার হিকমত
যেহেতু সন্ধ্যার পর ইসলামে দিন রাতের হিসাব শুরু হয় সেহেতু সন্ধ্যার সময় চাঁদ দেখা যাওয়ার মাধ্যমে নতুন মাসের হিসাব আসা জরুরী ছিল।
তাই আল্লাহ তাআলা চাঁদের গতি ও কক্ষপথ এভাবে নির্ধারণ করেছেন যে, নতুন চাঁদ সন্ধ্যা বেলায় দেখা যাবে। সমগ্র পৃথিবীর মানুষ আপন আপন অঞ্চলে সন্ধ্যা বেলায় নতুন চাঁদ দেখতে পাবে এবং মাস গণনা করতে পারবে। এ কথা ভালোভাবে মনে রাখবো, আমরা মাসের শুরুতে নতুন চাঁদকে ডুবার সময় দেখি। মাসের মধ্যখানে চাঁদকে উঠার সময় দেখি এবং মাসের শেষ দিকে আমরা চাঁদকে গভীর রাতে উঠতে দেখি। এখন নকশা বুঝবার চেষ্টা করি
১ম . ঘরে, ২৪টি দেশের নাম বসানো হয়েছে। এক দেশের সাথে অপর দেশের দূরত্ব ঘড়ির কাটায় এক ঘণ্টা। যেহেতু পুরো পৃথিবীতে সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় দিন-রাত হয় সেহেতু ২৪ ঘণ্টার হিসেবে এ নকশা তৈরি করা
হয়েছে।
২য়. ঘরে, ০. ১৫. ৩০ এগুলোকে ডিগ্রী বা দ্রাঘিমা বলে । এগুলো হল আমাদের প্রথম কথার দলিল। কেননা, সূর্যের আলো ১ ডিগ্রী অতিক্রম করতে ৪ মিনিট সময় লাগে । আর ৪×১৫=৬০ মিনিট। আর৬০ মিনিটে ১ ঘণ্টা ।
৩য়. ঘরে, সৌদি আরবে যখন সন্ধ্যা ৭টা হয় ঐ মুহূর্তে সমগ্র পৃথিবীতে কয়টা বাজে তা দেখানো হয়েছে। ভালো করে দেখে নিন। সৌদির পশ্চিমে ওই মুহূর্তে দিন দুপুর চলছে। আর সৌদির পূর্বে ওই মুহূর্তে রাত বা গভীর রাত চলছে। সমগ্র পৃথিবীতে একসাথে দিন বা রাত থাকে না; বরং কোথাও দিন থাকে আবার কোথাও রাত থাকে ।
সৌদির সাথে পশ্চিম দিক থেকে সূর্যের হিসেবে অন্যান্য দেশ কত ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থান করছে, তা দেখানো হয়েছে। এভাবে পূর্ণ পৃথিবীর হিসাব দেখে নিন ।
এবার মাসআলা বোঝার চেষ্টা করি
১. সৌদি আরবে সবসময় আগে চাঁদ দেখা যায় না। সৌদির আগেও কোনো কোনো দেশে চাঁদ দেখা যাওয়া প্রমাণিত আছে । যেমন, গত বছর ২০২২ এর ঈদুল ফিতরের চাঁদ আফগান, নাইজার ও মালি এই তিন দেশে আগে দেখা গিয়েছিল এবং মিডিয়াতে প্রচার হয়েছিল। তখন ঐ তিন দেশের লোকেরাই ঈদ করেছিল। সৌদিসহ পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ ঐ দিন ঈদ পালন করেনি।
রোজা-ঈদ পালনে বিভ্রান্তির নিরসন ৬
২. তবে অধিকাংশ সময় সৌদিতে আগে চাঁদ দেখা যায় । তখন স্বাভাবিকভাবে পশ্চিমের দেশগুলোতে চাঁদ দেখা যেতে থাকে।
৩. চাঁদ দেখা যাওয়ার সময় হচ্ছে সন্ধ্যা। ধরুন! সৌদিতে সন্ধ্যা ৭টায় সূর্য ডুবে গেল আর সেখানে চাঁদ দেখা গেল। তার ১ ঘণ্টা
পর মিশরে সন্ধ্যা হবে, চাঁদটা সেখানে চলে যাবে। মিশরের আকাশে মেঘ ইত্যাদি না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই চাঁদ সেখানে দেখা যাবে। সৌদির ২ ঘণ্টা পর তিউনিসিয়াতে সন্ধ্যা হবে এবং সেখানে চাঁদ দেখা যাবে। সৌদির ৩ ঘণ্টা পর লন্ডনে সন্ধ্যা হবে, চাঁদটা সেখানে দেখা যাবে। এভাবে পশ্চিম দিকে ঘুরতে ঘুরতে ২১ ঘণ্টা পর বাংলাদেশে সন্ধ্যা হবে এবং সেই সন্ধ্যায় স্বাভাবিকভাবে চাঁদটা বাংলাদেশের আকাশে দেখা যাবে । এভাবেই যুগ যুগ যাবত বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল দেশের আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে । আর এটাই চাঁদ দেখা যাওয়ার পদ্ধতি । যা বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে। কখনো কখনো এর ব্যতিক্রমও হয়ে থাকে। যা আমরা নকশার মাঝে “ফিত্না সৃষ্টি সম্ভাব্য এলাকাসমূহ” শিরোনামে লিখে দিয়েছি। একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর
সবাই জানে সৌদির সাথে বাংলাদেশের ব্যবধান ৩ ঘণ্টা আর আমরা দেখাচ্ছি ২১ ঘণ্টা । বিষয়টা জটিল মনে হচ্ছে ?
তাহলে বুঝুন! সূর্য আমাদের দেশ থেকে সৌদিতে যেতে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। আর সৌদি থেকে সূর্য পুনরায় আমাদের দেশে আসতে ২১ ঘণ্টা সময় লাগে। ২১ + ৩ = ২৪ ঘণ্টা হয়ে যায় ।
ঠিক তেমনিভাবে চাঁদ সৌদি থেকে আমাদের দেশে, পশ্চিম দিক থেকে ঘুরে আসতে ২১ ঘণ্টা সময় লাগে। যদি চাঁদ পূর্ব দিকে ঘুরতো তাহলে ৩ ঘণ্টার মধ্যে চলে আসতে পারতো।
মোটকথা, আমাদের দেশ থেকে চাঁদ-সূর্যের সৌদি যাওয়ার পথ ৩ ঘণ্টার দূরত্ব । সৌদি থেকে আমাদের দেশে আসার পথ ২১ ঘণ্টার দূরত্ব । আর চাঁদ-সূর্য গাড়ির মতো পিছনে আসে না। নিজ নিজ পথে পরিভ্রমণ করে । এটাই তাদের দায়িত্ব । চাঁদ সূর্যের পরিভ্রমণের মাধ্যমে আল্লাহ্ বান্দাগণ নিজ নিজ স্থানে নামাজ, রোজা, যাকাত, কুরবানী ইত্যাদি ইবাদতসমূহ যথাসময়ে বিনা সমস্যায় আদায় করতে পারেন এবং যুগ যুগ যাবৎ আদায় করে আসছেন ।
চাঁদের সংবাদ
পক্ষান্তরে আপনি যদি বলেন, হাদীস শরীফে তো চাঁদের সংবাদ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে । যেমন, আবু দাউদ শরীফের ২৩৩৯ নাম্বার হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাঁদের সংবাদ গ্রহণ করেছেন। তাহলে আপনারা কেন সৌদির বা সর্বপ্রথম যে দেশে চাঁদ দেখা যাওয়ার সংবাদ আসে সে দেশের চাঁদের সংবাদ গ্রহণ করছেন না ?
এর উত্তরে বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম দুটি সমাধান দিয়েছেন। ১.ব নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে চাঁদের সংবাদ গ্রহণের হাদীস পাওয়া যায়। আর সাহাবাগণের যুগে চাঁদের সংবাদ গ্রহণ না করার আমল পাওয়া যায় । যা সহীহ মুসলিমের ২৫২৮ নাম্বারে বর্ণিত হয়েছে। এখানে নবীজীর আমল ও সাহাবাগণের আমল পরস্পর বিরোধী দেখা যাচ্ছে। আর সাহাবাগণ সংঘবদ্ধ বা একাকীভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অমান্য করবেন তা কিছুতেই হতে পারে না । সাহাবাগণ আমাদের থেকে অবশ্যই দ্বীন বেশি বুঝতেন। নবীজীকে বেশি ভালোবাসতেন।
দ্বীনের উপর শতভাগ আমল করতেন । তারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনার উপরই আমল করেছিলেন।
নতুবা তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যেত। কেননা, তাদের সবার মেজাজ ছিল “দ্বীনের সামান্যতম ক্ষতি হবে আর আমি জীবিত থাকবো তা হতে পারে না” । তাই হাদীস বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, আবু দাউদ শরীফের হাদীস নিকটবর্তী এলাকার সংবাদ গ্রহণ করার পক্ষে দলিল হবার উপযুক্ত। আর সাহাবাগণের আমল যা সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে তা দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদের সংবাদ গ্রহণ না হওয়ার দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য । সুতরাং উভয় হাদীসের উপর আমল হয়ে গেল। কোনো হাদীসকে বর্জন করার প্রয়োজন হলো না। আর সাহাবাগণকে নবীজীর নির্দেশনার বিপক্ষে দাঁড় করানোর মত ক্ষতিকর কাজও করা লাগলো না। পক্ষান্তরে যারা সৌদি বা ভিন্ন দেশের চাঁদের সংবাদে রোজা ঈদ করতে চায় তারা সহীহ মুসলিমের ২৫২৮ নাম্বার এর হাদীসের উপর নানা রকমের আক্রমণ করে হাদীসটিকে শহীদ করতে চায় যা কখনোই কাম্য নয়।
২. তাদের ফতোয়া মোতাবেক যদি সৌদি বা ভিন্ন দেশের চাঁদের সংবাদ পৃথিবীর সকল দেশে গ্রহণ করা হয় তাহলে বিশ্ব মুসলিম ২১টি এমন
রোজা-ঈদ পালনে বিভ্রান্তির নিরসন ৮
সমস্যার সম্মুখীন হবেন যার কোনো সমাধান নাই । পক্ষান্তরে যদি আমাদের ফতোয়া মুতাবেক আমল করা হয় । যে আমল নববী যুগ থেকে
চলে আসছে, তাহলে কোনো সমস্যা থাকবে না। ইনশাআল্লাহ । গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি তথ্য
আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মানুষ বলে বেড়াচ্ছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর মুসলমানরা এক সাথে রোজা-ঈদ করে আর আমরা নাকি একদিন পরে করি ।
প্রিয় দেশবাসী! এটি একটি ভুল কথা। মারাত্মক ভুল কথা। খুব ভালো ভাবে মনে রাখবেন, সমগ্র বিশ্বের মুসলমানগণ নিজ দেশে চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করেই রোজা-ঈদ পালন করেন । আর এটাই শরীয়তের বিধান। প্রমাণ স্বরূপ দেখুন-
১৪৪৩ হিজরীর ঈদুল ফিতর
১৪৪৩ হিজরীর ঈদুল ফিতরের চাঁদ সর্বপ্রথম ৩০ শে এপ্রিল শনিবারে আফগান, নাইজার ও মালিতে দেখা গিয়েছিল । তাই উক্ত তিন দেশের মুসলমানগণ ১লা মে ২০২২ ইং রবিবারে ঈদ করেছিল। পৃথিবীর আর কোনো দেশে উক্ত তারিখে চাঁদ দেখা যায়নি। আর কোনো দেশে ১ লা মে ঈদ হয়নি । তাহলে একথা কিভাবে সত্য হয় যে, বিশ্বের সকল মুসলমান এক দেশের চাঁদের সংবাদে রোজা-ঈদ করে। সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, “সৌদি আরব অন্য দেশের চাঁদের সংবাদের ভিত্তিতে রোজা-ঈদ করে না ।”যদি অন্য দেশের চাঁদের সংবাদের ভিত্তিতে রোজা ঈদ পালন করা শরীয়তে আবশ্যক হত, তাহলে অবশ্যই সৌদিসহ অন্য সকল মুসলিম দেশ আফগানিস্তানের সাথে তাল মিলিয়ে ঈদ পালন করত। বিস্তারিত জানতে গুগলে সার্চ করুন“আফগানিস্তান,নাইজার, মালিতে ঈদ উদযাপন। ” তবে আফগানিস্তানের সাথে তাল মিলিয়ে সাদ্রা পরিবারের একাংশ ঐ দিন ঈদ উদযাপন করেছিল । বিস্তারিত জানতে গুগলে সার্চ করুন
“আফগানিস্তানের সাথে মিল রেখে চাঁদপুরের দুই গ্রামে ঈদ উদযাপন।” ১৪৪৩ হিজরীর ঈদুল ফিতর
১৪৪৩ হিজরীতে বিশ্বে সর্বপ্রথম ঈদুল ফিতরের চাঁদ সৌদি আরবে দেখা গিয়েছে। তারপর পশ্চিমের দেশগুলোতে দেখা গিয়েছে। ফলে সৌদি ও তার পশ্চিমের দেশগুলোতে ২১ শে এপ্রিল ২০২৩ শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে । আর ১৮০ ডিগ্রি দ্রাঘিমার পশ্চিমে নাওরু থেকে ওমান
পর্যন্ত সকল দেশে ২২ শে এপ্রিল শনিবারে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। তাহলে বিশ্বের সকল মুসলমান একই দিনে রোজা-ঈদ করে শুধমাত্র বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কিছু মানুষ করে না। এ কথাটি কত বড় ভুল । এটা আমাদের জেনে রাখা ভালো। বিস্তারিত জানতে সার্চ করুন- “৮ দেশে ঈদুল ফিতর শনিবার।”
ওমানের অবস্থা
ওমান সৌদি আরবের পার্শ্ববর্তী দেশ । তারাও সৌদির চাঁদের সংবাদের ভিত্তিতে রোজা-ঈদ পালন করে না । কখনো ওমান সৌদির সাথে চাঁদ দেখে থাকে আবার কখনো বাংলাদেশের পরে চাঁদ দেখে রোজা-ঈদ পালন করে। এভাবেই সমগ্র পৃথিবীর মুসলমানগণ রোজা-ঈদ পালন করেন । তবে দু’একটি দেশে আমাদের দেশের মত রোজা-ঈদ পালনের বিষয়ে ঝামেলা থাকতে পারে । সার্চ করুন “সৌদিতে হলেও ওমান ও মরক্কোয় ঈদ উদযাপন হচ্ছে না আজ ।”
ঈদ নকশা অনুযায়ী হয়েছে ?
১৪৪৩ হিজরীর ঈদুল ফিতর আমাদের নকশা অনুযায়ী হয়েছে। সর্বপ্রথম ২৯ রোজায় শুক্রবারে সৌদি আরব চাঁদ দেখেছে এবং সর্বশেষ ৩০ রোজা পূর্ণ করে শনিবারে ওমানে ঈদ হয়েছে। অথচ ওমান সৌদির প্রতিবেশী দেশ। তবুও ওমান সৌদির চাঁদের সংবাদে ঈদ করেনি এবং করেও না । তাহলে বুঝা গেল পূর্ণ পৃথিবী এক দেশের চাঁদের সংবাদে রোজা-ঈদ করে এ তথ্য সম্পূর্ণ ভুল; বরং সবাই নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখে রোজা-ঈদ করে । ১৪৪৪ হিজরীর ঈদুল আযহা
১৪৪৪ হিজরীর ঈদুল আযহা পূর্ণ পৃথিবীতে দুই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওমান, সৌদিসহ পশ্চিমের দেশসমূহে ২৮শে জুন ২০২৩ রোজ বুধবারে এবং ১৮০ ডিগ্রি দ্রাঘিমার পশ্চিমের দেশসমূহ যথা- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ আরো অনেক দেশে ২৯ শে জুন ২০২৩ রোজ বৃহস্পতিবার ঈদুল আযহা উদযাপিত হয়েছে । গুগলে সার্চ করে আপনি উক্ত বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেন এভাবে লিখুন:- “মালয়েশিয়াসহ ৩ দেশে ঈদুল আযহার তারিখ ঘোষণা ।” তাহলে বুঝা গেল পূর্ণ পৃথিবীর মুসলমান সকলেই নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখেই রোজা-ঈদ পালন করছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগ
থেকে ইন্টারনেট আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত সবাই এভাবেই আমল করতেন ।
খুব ভালো করে মনে রাখতে হবে, রোজা-ঈদ পালনের ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে “চাঁদ দেখা কিংবা নিকটবর্তী এলাকা থেকে সঠিকভাবে চাঁদ উদয়ের সংবাদ পাওয়া। আর ফিৎনার এ যুগে এমন নীতিকে মাড়ির দাঁত দ্বারা আকড়ে ধরতে হবে। যেমন এক হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, “আমার পর তোমাদের মধ্যে যে জীবিত থাকবে সে অচিরেই নানারূপ মতানৈক্য দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নত এবং সুপথপ্রাপ্ত খুলাফাদের (সাহাবাগণের) সুন্নতকে মাড়ির দাঁতে কামড়ে ধরার ন্যায় মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে।”
(আবু দাউদ- ৪৬০৭, তিরমিযী- ২৬৭৬) মিডিয়ার সংবাদে বিভ্রান্তি
অনেক ভাই মনে করেন আধুনিক এ যুগে মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা সকল ধরনের বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকতে পারি। তাই তারা মিডিয়ার সংবাদকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন । আর বলেন মিডিয়ার এ যুগে চর্ম চক্ষে চাঁদ দেখার প্রয়োজনীয়তা আর বাকি নাই । অথচ দেখুন মিডিয়ার সংবাদেও বিভ্রান্তি রয়েছে। বৈপরিত্য রয়েছে।
গত ১৪৪৫ হিজরী সনের জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়া নিয়ে সৌদি আরবে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সৌদির সুপ্রিম কোর্ট সন্ধ্যা ৭টায় জিলহজ্জের চাঁদ দেখা যায়নি মর্মে ঘোষণা দিয়েছে। অপর দিকে পবিত্র দুই মসজিদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে চাঁদ দেখার সংবাদ প্রচার করেছে। বিস্তারিত জানতে গুগলে সার্চ করুন “সৌদিতে চাঁদ দেখা নিয়ে ধোঁয়াশা।”
প্রিয় ভাই ও বোনেরা ! তাহলে বলুন আমরা কিভাবে মিডিয়ার সংবাদের উপর আস্থা রেখে ঘুমিয়ে থাকবো । আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন ।
সর্বশেষ আবেদন
প্রিয় দেশবাসী! রোজা-ঈদ এটি ধর্মীয় বিষয়। এ বিষয়ে ধর্মীয় পন্ডিত, হক্কানী ওলামাদের সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য। এটি কোনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার, মিস্টার বা কবিরাজের বিষয় নয় । তাই হক্কানী আলেমদের সিদ্ধান্তকে বর্জন করে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এটি কখনোই হেদায়েতের কারণ হতে পারে না; বরং ভ্রষ্টতার কারণ হতে পারে । আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনি বুঝ দান করুক।
আমিন সুম্মা আমীন
মুফতি জুবায়ের বিন আব্দুল কুদ্দুছ
শিক্ষক লালবাগ মাদ্রাসা
খতিব আজিমপুর ছাপড়া জামে মসজিদ