বিশেষ প্রতিনিধি: মুস্তাফা কামাল

প্লাস্টিক দূষণ একটি বিস্তৃত পরিবেশগত সমস্যা, যা বিশ্বব্যাপী বাস্তুতন্ত্র, মানব স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে এ চ্যালেঞ্জটি বর্তমানে পৌঁছেছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে, যা শহর ও গ্রামীণ উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশে দ্রুত নগরায়ণের পাশাপাশি বাড়ছে জনসংখ্যা। কিন্তু সে তুলনায় অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা; গড়ে উঠছে না পরিকল্পিত পরিকাঠামো। এ অবস্থায় প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলা হয়ে ওঠেছে অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি বড় অংশ ভাগাড়, জলাশয় ও নদীতে ফেলা হয়। থ্রি আর কৌশল তথা রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল বা ব্যবহার হ্রাস, বারবার ব্যবহার ও নতুন করে অন্য কিছু তৈরি করার কৌশল অবলম্বন করে প্লাস্টিকের চক্রাকার ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত করা সম্ভব।
ঢাকার মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের মাত্র ৩৭.২ শতাংশ রিসাইকেল বা অন্য কাজে লাগানো হয়। বাংলাদেশের তুলনায় ইউরোপের দেশগুলোতে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারের গড় ১০০ কেজির বেশি। কিন্তু তারপরও প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ প্লাস্টিক-দূষিত দেশগুলোর অন্যতম।

গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে ২০২০ সালে তিনগুণ বেড়ে ৯ কেজি হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারিকালে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বাড়ায় এর দূষণ আরও বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ঢাকায় বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার শহরাঞ্চলের জাতীয় গড় থেকে তিনগুণেরও বেশি, যা বর্তমানে ২২.২৫ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, যা পুরো বাংলাদেশে উৎপন্ন বর্জ্যের ১০ শতাংশ।

সমস্যার মাত্রা কতটা
১৬ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যাপক চাপের সম্মুখীন। দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ নদী, খাল এবং বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে।

এ সমস্যায় বড় ভূমিকা রাখছে রাজধানী শহর ঢাকা। কারণ এর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং শিল্প কার্যক্রম একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করছে।

প্লাস্টিকের পরিবেশগত প্রভাব
প্লাস্টিক দূষণের পরিবেশগত পরিণাম মারাত্মক। বুড়িগঙ্গা ও যমুনা নদীসহ বাংলাদেশের নদ-নদী ও জলাশয় প্লাস্টিকে ব্যাপকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে।

এ দূষণ শুধুমাত্র জলজ জীবনের ক্ষতি করছে না, মাছ ধরা ও কৃষিকাজের জন্য এ জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল সম্প্রদায়ের জীবিকাকেও ব্যাহত করছে। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বিশেষ ঝুঁকির মুখে। প্লাস্টিক বর্জ্য সামুদ্রিক প্রাণীদের মৃত্যু এবং প্রবাল প্রাচীরের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে।

মানব স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
মানব স্বাস্থ্যের ওপর প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব গভীর। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা এবং পোড়ানোর ফলে বাতাসে বিষাক্ত রাসায়নিক নির্গত হয়, যা শ্বাসযন্ত্রের রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে।

বড় প্লাস্টিকের জিনিসগুলো ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয়, যা পানীয় জলের উৎসগুলোতে পাওয়া গেছে। এটি মানব শরীরে জমা হয় এবং স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব
প্লাস্টিক দূষণের উল্লেখযোগ্য আর্থ-সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু সৈকত ও পর্যটন স্পটগুলো প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে ভরে যাওয়ায় এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদী ও জলাশয়ের দূষণের কারণে মাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে মৎস শিল্প চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যা লাখ লাখ মানুষের জীবিকাকে প্রভাবিত করছে।

সরকারি উদ্যোগ ও নীতি
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকার প্লাস্টিক দূষণ মোকাবেলায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস করার লক্ষ্যে এটা ছিল একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। যদিও আইনটির প্রয়োগে বেশ অসঙ্গতি রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও সীমিত।

সরকার প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করার জন্য বেশকিছু নিয়মও চালু করেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২০১০ সালে চালু করা হয় ন্যাশনাল থ্রি আর (রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল) কৌশল, যার লক্ষ্য বর্জ্য উৎপাদন কমানো এবং পুনর্ব্যবহার পদ্ধতির উন্নত করা।

এছাড়া, বাংলাদেশের গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

তৃণমূল আন্দোলন ও সামাজিক উদ্যোগ
সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অসংখ্য তৃণমূল আন্দোলন এবং সামাজিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং সুশীল সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং প্লাস্টিকের টেকসই বিকল্প প্রচারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

‘ক্লিন কক্সবাজার’ অভিযান এবং ‘প্লাস্টিক মুক্ত নদী’ প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো মানুষের উল্লেখযোগ্য মনোযোগ আকর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করেছে।

চ্যালেঞ্জ ও সামনে এগোনোর পথ
এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ প্লাস্টিক দূষণের কার্যকর ব্যবস্থাপনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিদ্যমান আইনের দুর্বল প্রয়োগ, জনসচেতনতার অভাব এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য অপর্যাপ্ত অবকাঠামো প্রধান বাধা। এ চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে একটি বহুমুখী পদ্ধতি প্রয়োজন।

আইনের প্রয়োগ জোরদার
প্লাস্টিক নিষেধাজ্ঞা এবং নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং আইন অমান্যকারীদের জন্য জরিমানা।

টেকসই বিকল্পের প্রচার
প্লাস্টিকের পরিবেশ-বান্ধব বিকল্প যেমন পাটের ব্যাগ ও সহজেই পচনশীল প্যাকেজিং ব্যবহারে উৎসাহিতকরণ প্লাস্টিক বর্জ্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামোর উন্নয়ন
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা যেমন — রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরির প্ল্যান্টের মতো খাতে বিনিয়োগ করা প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য।

জনসচেতনতা ও শিক্ষণ
প্লাস্টিক দূষণের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করার বিষয়টি আচরণগত পরিবর্তন আনতে পারে এবং যথাযথ বা নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার চর্চাকে উৎসাহিত করতে পারে।

সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব
সরকার, শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের দায়ীত্বশীলদের কাজে লাগানো প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় একটি সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি রাখে। যদিও নীতিগত পদক্ষেপ এবং সমাজের নানা উদ্যোগের মাধ্যমে এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

তবে পরিবেশ, মানব স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রভাব প্রশমিত করার জন্য আরও অনেক কিছু করা দরকার। একটি সামগ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করে বাংলাদেশ একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও আরও টেকসই ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করতে পারে।