আগামীকাল ১ সেপ্টেম্বর রবিবার প্রতিষ্ঠার ৪১ বছর পালন করবে বিএনপি। দেশের সংসদীয় ইতিহাসে তিনটিতে কর্তৃত্ব করলেও টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে দলটি। এর মধ্যে গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর হতভম্ব অবস্থায় রয়েছে তারা। নির্বাচনের ৮ মাস পর মাঠপর্যায়ে তেমন কর্মসূচি না থাকলেও প্রচারযন্ত্রে বেশ সক্রিয় দলটির নেতাকর্মীরা। তবে গত দেড় মাসে দলের সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বশেষ নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করার পরও সংসদে গিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে না পারায় মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ বিএনপি। শুভানুধ্যায়ীদের কারও কারও মতে, বিএনপির উচিত সবার আগে জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়া।


বিএনপির শরিক দলগুলোর নেতারা মনে করছেন, দল পরিচালনায় একক কর্তৃত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি একাধিক প্রতিবেশী দেশসহ পশ্চিমা ও ইউরোপের বন্ধুদের পরামর্শ নিচ্ছেন।
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘মানুষের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি করবে সেরকম কোনও আবহ তৈরি করতে পারেনি বিএনপি।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের সমালোচনা, তাদের কারণে যে অনেক বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, সেটা দলটি করতে পারছে না। বিএনপির নেতৃত্বের যে সংকট, তাদের নেতৃত্বের ওপর মানুষের যে আস্থা সৃষ্টি হওয়া দরকার, সেটা তারা অর্জন করতে পারেনি।’
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘বিএনপির কার্যক্রম বিকল্প হিসেবে দেশের রাজনীতিতে সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এটা ঠিক যে, আমাদের নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে, বাড়াবাড়ি আছে, দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন আছে। তা সত্ত্বেও তারা যে বিকল্প, বিএনপি তা প্রমাণ করতে পারেনি।’
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘একাদশ নির্বাচন ইস্যুতে যে একটা প্রশ্ন ছিল, তারা যদি একটা ছায়া মন্ত্রিসভা করে মানুষের সামনে একটি বিকল্প দাঁড় করাতে পারতো। এতে ইতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো।’
তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: বহু নাটকের পর বিএনপি সংসদে গেলো, সেখানেও কিন্তু তারা সিস্টেম্যাটিক্যালি, প্ল্যান ওয়েতে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করাসহ অনেকগুলো গঠনমূলক কাজ করতে পারে।’ এ পর্যন্ত তাদের মধ্যে তা দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত ২০ বছর ধরে বিএনপির সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে ২০ দলীয় জোট। এ ছাড়া একাদশ নির্বাচনের আগে আত্মপ্রকাশ করা ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিকও তারা। উভয় জোটকেই নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে বিএনপি।


গত ১০ জুন ফ্রন্টের সর্বশেষ বৈঠক হয়। তবে সেখানে ড. কামাল ও মাহমুদুর রহমান মান্নার অনুপস্থিতিতে তা গুরুত্ব পায়নি। নিষ্ক্রিয়তা ও সংসদে যোগ দেওয়ার কারণ দেখিয়ে গত ৮ জুলাই ফ্রন্ট ছাড়েন কাদের সিদ্দিকী। তার ভাষ্য, সার্বিক বিবেচনায় ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজন নেই। 
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম একজন উদ্যোক্তা শনিবার (৩১ আগস্ট) রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বরের পর বিএনপি কোনও কর্মসূচি দেয়নি। কোথাও নেই তারা এখন। দলটি পরিচালিত হচ্ছে তারেক রহমানের একক কর্তৃত্বে।’ কর্তৃত্ববাদিতা ছাড়া বিএনপিতে কিছু নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট সক্রিয় হবে কী করে? বড় দল বিএনপি। তারা কিছু না করলে আমাদের মতো ছোট দল কী করবে?’

ফ্রন্টের অন্যতম এই নেতা মনে করেন, বিএনপি এখন তাদের কথা শুনছে, যাদের কথা শুনে ২০১৪ সালে সংলাপ হয়েছিল। সেসময় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ১ বছরের জন্য থাকবেন, কিন্তু থাকলেন পুরো ৫ বছর। এখনও বিএনপি তাদের বন্ধুদের কথা শুনছে যারা বলছেন, ২ বছর সময় দিন, এরপর ক্ষমতায় আসবেন।
তিনি বলেন, ‘সমস্যা তো বিএনপির নেত্রীর, তিনি তো জেলে, তারা তাকে কীভাবে বের করবেন? কিছুদিন আগে মহাসচিব বলেছেন, আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলবেন খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গটি। পৃথিবীর কোন ফোরামে তুলবেন, সেটি তিনি বলতে পারবেন।


ফ্রন্টের এই নেতা আরও বলেন, ‘সমস্যা তো বিএনপির নেই, সামাজিক অবস্থান ভালো, নেতাদের ব্যবসা ভালো। সকাল-বিকাল প্রচার হচ্ছে, নেতারা খুশি।’
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘ভীরু-কাপুরুষ কখনও জাতিকে মুক্তি দিতে পারে না। বিএনপির সময় হয়েছে ভীরুতা ত্যাগ করে জিয়াউর রহমানের যে সাহস, সেটার বলে বলিয়ান হয়ে সামনে এগিয়ে আসা। তা না হলে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা।’
তিনি বলেন, ‘জামায়াতকে পরিষ্কারভাবে ছেড়ে দেওয়া উচিত। ক্ষমা না চাইলে তাদের সঙ্গে রাখার কোনও দরকার নেই বিএনপির। এটা যতক্ষণ না করবে, তাদের ২০ দলীয় জোট থেকে বের করে দেওয়া উচিত।’
বিএনপি কেন জামায়াতকে বের করছে না, এমন প্রশ্নে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘তাদের বের করে দিলে তো বিএনপির মাঠে নামার চাপ বাড়বে। এখন অজুহাত দিয়ে দিয়ে বেড়াচ্ছে।’ কোনও কারণ নেই, কোনও কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।


ঐক্যফ্রন্টের আরেক নেতা এমন প্রশ্ন তোলেন, ‘এখন কি আওয়ামী লীগের চেয়ে জামায়াত বেশি খারাপ?’
ফ্রন্টসূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে ফ্রন্টের কার্যক্রম নিয়ে ড. কামালের সঙ্গে বৈঠক করেন ডা. জাফরুল্লাহ। এছাড়া আ স ম আবদুর রব বামপন্থী ও ধর্মভিত্তিক একাধিক দল নিয়ে জোট করার কথা শরিক নেতাদের কাছে প্রচার করছেন। যদিও এসব বিষয়ে ফ্রন্টের অন্যতম প্রভাবশালী এক নেতা দাবি করেন, ‘বিএনপি বা ফ্রন্ট বা নতুন কোনও জোট কী দাবিতে সক্রিয় হবে, এর উত্তর বিএনপির কাছে আছে।’
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট কায়দায় একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আগের রাতেই মানুষের ভোট ডাকাতি হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে আমাদের নেতাকর্মী, দেশের জনগণ একটু হতভম্ব। হতভম্ব অবস্থা কাটা দরকার।’ সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোই বিএনপির এখন উদ্দেশ্য, লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াত প্রসঙ্গে বিএনপির জ্যেষ্ঠ এই নেতা বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু দৃশ্যমান তো এটাই যে, তাদের সঙ্গে আমাদের একটি দূরত্ব আছে। যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, নিশ্চয়ই সাংবাদিকরা আগে জানবেন।’
বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর শীর্ষপর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে থাকলেও স্থায়ী কমিটির নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা খুবই কম। দলের প্রথম ও মধ্যম সারির নেতাদের নেতৃত্বও প্রশ্নবিদ্ধ। যে কারণে সর্বশেষ ছাত্রদলের কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত ও বিদ্রোহী ছাত্রনেতাদের নমনীয় করতে হয়েছে সরাসরি তারেক রহমানকেই। তার হস্তক্ষেপেই বহুদিন পর সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছে তৃণমূল। যদিও কাউন্সিল ঘিরে সিন্ডিকেটের ভূমিকা ব্যাপক। 


বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল পক্ষ বলছে, দলের যেকোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্থায়ী কমিটির নেতাদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ২৩ আগস্ট নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় একটি ফোরাম হয়েছে। এই ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী। অঙ্গসংগঠন হিসেবে মহিলা দল থাকলেও অকার্যকর রেখে পৃথক ফোরাম গঠন করায় স্থায়ী কমিটির বাকি সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। স্থায়ী কমিটিতে থেকেও আলাদা ফোরামের আহ্বায়কের পদ নিয়েছেন সেলিমা ইসলাম। গত ২৫ আগস্ট যুক্তরাজ্য কৃষক দলের কমিটি দিয়ে সেদিনই রাতে আবার কমিটির খবর প্রচার না করার অনুরোধ আসে গণমাধ্যমে। 

বিএনপির ঢাকা মহানগরের একাধিক নেতা জানান, বিএনপির তৃণমূলে শক্তি আছে। কিন্তু রাজধানীতে বেশি দুর্বল। সিটি করপোরেশনের মতো দলীয় কমিটি দুভাগ করেও ঢাকাতে গতিশীলতা আনতে পারেনি নেতৃত্ব। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জ্জা আব্বাসের সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি হাবিবুন নবী খান সোহেল শক্ত কোনও অবস্থান দাঁড় করাতে পারেননি। এখন দূরবর্তী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আসনে (রংপুর-৩) যুক্ত করার চিন্তা চলছে জ্যেষ্ঠনেতাদের একটি অংশের। ঢাকা উত্তরের নেতৃত্ব প্রায় উধাও।
বিএনপির বিভিন্ন উইংয়ে রয়েছে দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত অভিযোগ। গত দেড় মাসে ডেঙ্গু নিয়ে রাজধানীতে বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা লিফলেট প্রচারণা করলেও এতে একাদশ সংসদের প্রার্থীরা ছিলেন অনুপস্থিত। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী, আমিনুল ইসলাম, তাবিথ আউয়ালসহ কয়েকজন ডেঙ্গু সচেতনতা ও মিরপুর আগুনে পোড়া বস্তির বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ালেও অধিকাংশ নেতা ছিলেন নিষ্ক্রিয়।


ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির একাধিক সদস্য জানান, দলের বিদেশনীতিতে ভারতের অবস্থান এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। উইংয়ের অধিকাংশ সদস্য ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছেন একজন সদস্য। ২ মাস আগে একবারের পর বিশেষ কোনও বৈঠক করেনি এই উইং। কাশ্মীর ইস্যুতে দলের অবস্থান ব্যক্ত করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি। এছাড়া স্থায়ী কমিটির সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল পরিষ্কারভাবেই জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে দলীয়ভাবে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রয়েছে বিএনপির। ফলে, কাশ্মীর ইস্যুতে এমন কিছু বলা যাবে না, যাতে ভারত বিব্রত হয়। এছাড়া আসাম-পরিস্থিতি নিয়েও দলটির পক্ষ থেকে নীরবতা দেখা যাচ্ছে।
অবশ্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে গত ২৮ আগস্ট একটি গোলটেবিল আয়োজনে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। ওই সভায় প্রায় ১২ বছর পর বিএনপির আয়োজনে যোগ দেন সাবেক সচিব মোফাজ্জল করিম। সাবেক এই হাইকমিশনারের যোগদানকে বিএনপির কেউ কেউ সাফল্য হিসেবে দেখছেন।


দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও নির্বাচনে ত্রুটির বিষয়ে দলের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাজ করার কথা থাকলেও কোনও অগ্রগতি নেই। নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে সব আসন থেকে মামলা করার সিদ্ধান্ত থাকলেও সেগুলোকে সচল রাখার আগ্রহ কম দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবীরদের।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটারে দলীয় খবর ‘বিএনপিকমিউনিকেশনস’ পেজ থেকে প্রচার করা হয়। তবে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘দল পরিচালনার কৌশলে অনেক পরিবর্তন আনা হলেও এসব বিষয় এখনও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়নি। সাংগঠনিক কাজ গুছিয়ে এসব কাজে হাত দেওয়া যাবে।’ এর আগে স্থায়ী কমিটিতে বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে হবে, বিক্ষিপ্তভাবে সমাধানের কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।