banner

ড. ইউসুফ আল-কারজাভি 

অন্যায়ের প্রতিবাদ মুমিন ব্যক্তি কখন কিভাবে করবে তার নির্দেশনা রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিহত করে, যদি সে তাতে সক্ষম না হয়, তবে সে যেন মুখে প্রতিবাদ করে; আর যদি সে তাতেও সক্ষম না হয়, তবে মনে মনে তা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করে। এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৯)

উল্লিখিত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় অন্যায়ের প্রতিবাদ স্তরভিত্তিক এবং হাত তথা শক্তি প্রয়োগ করে অন্যায় প্রতিহত করার বিষয়টি শর্তাধীন। কিন্তু চরমপন্থীরা এসব শর্তের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না।

পরিবর্তন প্রচেষ্টার ক্রমবিন্যাস : ইমাম গাজালি (রহ.)-এর মতে অন্যায়ের প্রতিবাদ ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্রমবিন্যাস রয়েছে। তা হলো—১. অন্যায়ের পরিচয় তুলে ধরা এবং সচেতন করা, ২. আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি ও পুরস্কারের বর্ণনা দেওয়া, ৩. ধমক ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা, ৪. সশরীরে বাধা দেওয়া, ৫. আঘাত করা, ৬. অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করা। (ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন : ২/৩২৯-৩৩৩)

রাষ্ট্রীয় আইনকে উপেক্ষা নয় : শক্তি প্রয়োগ পরিবর্তনের চূড়ান্ত স্তর। বিশেষত যখন অস্ত্রধারণের প্রশ্ন থাকে। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইসলাম ততক্ষণ শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেয় না, যতক্ষণ না ব্যক্তি অন্যায়কারীর চেয়ে বেশি শক্তিধর হয়। তবে মনে রাখতে হবে, বর্তমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এই পর্যায়ের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অনুমতি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দেয় না। কেউ শক্তি প্রয়োগ করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চাইলে তাকে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিধি-নিষেধের আওতায় পড়তে হবে। তাই কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদে শক্তি প্রয়োগ করলে রাষ্ট্রীয় আইনে সে অপরাধী বিবেচিত হবে এবং বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হবে।

শক্তি প্রয়োগের পূর্বশর্ত : ইসলাম কোনো অন্যায় কাজের প্রতিবাদে শক্তি প্রয়োগ করার আগে কিছু আরোপ করেছে, যা পূর্ণ না হলে ব্যক্তির জন্য অন্যায়ের প্রতিবাদে শক্তি প্রয়োগ করা বৈধ হবে না। তা হলো—

১. কাজটি সর্বসম্মতিতে হারাম হওয়া : হাদিসে যে অন্যায়ের পরিবর্তন শক্তি প্রয়োগ করে করতে বলেছে, তা সর্বসম্মতিতে হারাম প্রমাণিত হতে হবে। অর্থাৎ বিষয়টির ব্যাপারে শরিয়ত ইহকালীন ও পরকালীন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছে। তা হলো—কবিরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া বা সগিরা গুনাহ বারবার করা। সুতরাং যে ব্যক্তি মাকরুহ কাজ করে বা সুন্নত-নফল ত্যাগ করে, সে এই পর্যায়ের অন্যায়কারী বিবেচিত হবে না। একইভাবে যে ব্যক্তি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীকগুলো ত্যাগ করে। যেমন—আজান, নামাজের জামাত, ঈদের জামাত, খতনা ইত্যাদি। এসব কাজ অন্যায় হলেও ব্যক্তি তার প্রতিবাদ করবে না। বরং বলা হবে কোনো ব্যক্তি বারবার এসব কাজ করলে ইসলামী রাষ্ট্রের আদালত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

২. মতবিরোধপূর্ণ বিষয় না হওয়া : শক্তি প্রয়োগের জন্য অন্যায়গুলো শরিয়তের অকাট্য দলিল দ্বারা হারাম প্রমাণিত হতে হবে। কোনো মুজতাহিদের মতানুসারে তা হারাম হলে সেখানে শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। কেননা মুজতাহিদের ভুল করার আশঙ্কা রয়েছে। যদি বিষয়টি এমন মতবিরোধপূর্ণ হয় যে প্রাচীন বা আধুনিককালের ইসলামী আইনজ্ঞরা তার জায়েজ ও না জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন, তবে তা এমন ‘মুনকার’ বা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না, যা পরিবর্তনে শক্তি প্রয়োগ করা বৈধ হয়। বিশেষত ব্যক্তির জন্য। এ জন্য শরিয়তের মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মতবিরোধপূর্ণ ও গবেষণালব্ধ বিষয়ে কোনো অপরাধ নেই’।

যখন ইসলামী আইনজ্ঞরা ছবি অঙ্কন, কিছু বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার, নারীর চেহারা ও হাত খোলা রাখা, নারীদের বিচারক পদে নিয়োগ দেওয়া এবং অন্য দেশে চাঁদ দেখা গেলে রোজা ভেঙে ফেলার ব্যাপারে মতবিরোধ করেছেন, তখন কোনো মুমিনের জন্য তার একটি চূড়ান্ত মত হিসেবে গ্রহণ করে তা নিয়ে গোঁড়ামি করার অবকাশ নেই। এমনকি বেশির ভাগ আলেমের মত বা চার মাজহাবের সম্মিলিত মত ভিন্নমতকে অকার্যকর করতে পারে না এবং এতে তা মূল্যহীন হয়ে যায় না, যদিও ভিন্নমত পোষণকারী একজনও হন। যদি তিনি ইজতিহাদের যোগ্য হন।

৩. অপরাধ ব্যাপকতা লাভ করা : অপরাধ যখন প্রকাশ্যরূপ নেয় এবং ব্যাপকতা লাভ করে, তখনই সমাজের মানুষ শক্তি প্রয়োগ করে তা পরিবর্তনের চিন্তা করবে, চেষ্টা করবে। নতুবা কেউ গোপনে ঘরের ভেতরে কোনো অপরাধ করলে তা বের করার জন্য গোয়েন্দাগিরি করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্য প্রকাশ করা অথবা তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করা ব্যক্তিবিশেষের জন্য বৈধ নয়। কেননা ইসলাম গোপন অপরাধের বিচার আল্লাহর অধিকারে ছেড়ে দিয়েছে। আল্লাহ পরকালে তাদের শাস্তি দেবেন অথবা ক্ষমা করে দেবেন। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সবাই ক্ষমা লাভ করবে প্রকাশ্যে পাপকারী ছাড়া।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৬৯)

তবে রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্র এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে, যেন তা প্রকাশ্যরূপ ধারণ না করে।

৪. পরিবর্তনের সামর্থ্য থাকা : পরিবর্তনে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অবস্থার পরিবর্তনের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা। এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির অধীন হয়। যেমন—স্বামী তার স্ত্রীকে, বাবা সন্তানদের—যারা তার অধীন ও তত্ত্বাবধানে রয়েছে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের, শাসক ও রাষ্ট্র শাসনাধীন ব্যক্তি ও সমাজকে পরিবর্তনে সীমার মধ্যে থেকে (প্রচলিত আইন) চেষ্টা করতে পারে। যার পরিবর্তনের এই সামর্থ্য নেই, সে জবানের মাধ্যমে চেষ্টা করবে। তা হলো সচেতনতা তৈরি, উপদেশ প্রদান, পুরস্কার ও শাস্তির আলোচনা, কাজের ভালো-মন্দ পরিণতি তুলে ধরা ইত্যাদি।

৫. বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার ভয় না থাকা : এই আশঙ্কা থাকা যে যদি শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে, নিরীহ মানুষের জীবন ও সম্পদ হুমকির মুখে পড়বে, শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে; বিপরীতে অন্যায়-অপরাধ নানা মাত্রায় বেড়ে যাবে। পবিত্র কোরআনে যেমনটি ইরশাদ হয়েছে, ‘মুসা বলল, হে হারুন! তুমি যখন দেখলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল আমার অনুসরণ করা থেকে? তবে কি তুমি আমার আদেশ অমান্য করলে? হারুন বলল, হে আমার সহোদর! আমার শ্মশ্রু ও চুল ধরো না। আমি আশঙ্কা করেছিলাম যে তুমি বলবে—তুমি বনি ইসরাঈলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ এবং আমার নির্দেশ পালনে যত্নবান হওনি।’ (সুরা ত্ব-হা, আয়াত : ৯২-৯৪)

‘ফিকহুল জিহাদ’ থেকে

মো. আবদুল মজিদ মোল্লার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর

banner