“ও মোর রমজানের ই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। ”
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। তবে ইসলাম এ খুশি উদযাপনের নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই মুমিনরা যাচ্ছে-তাই করে ঈদ আনন্দ করতে পারে না।
প্রতিবছরের মতো এবছরও শ্রেষ্ঠতম মাস মাহে রমাদান এসেছিল । আর এ মাস আমাদের কাছে নানা শিক্ষা নিয়ে হাজির হয়ে থাকেন। তবে পবিত্র কুরআনের ভাষা অনুযায়ী তা হলো ‘তাকওয়া অর্জন করা’ তথা খোদাভীতি, আত্মশুদ্ধি। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পারো” (সূরা বাকারা- ১৮৩)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যে আত্মশুদ্ধি অর্জন করেছে, সেই সফলকাম” (সূরা আল আ’লা-১৪)। এছাড়াও মাহে রমাদানের অসংখ্য পরোক্ষ শিক্ষা রয়েছে।দীর্ঘ একটি মাস ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহওয়ালা হওয়াই যেন ঈদের পরিপূর্ণতা। ঈদ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় উৎসব। ঈদ আরবী শব্দ। যে দিন মানুষ আনন্দ উদযাপনের জন্য একত্রিত হয় এবং যে দিনটি বার বার ফিরে আসে এমন দিনকে ঈদ বলা হয়।
ঈদের দিন একে অপরকে বলে “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম ” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আপনার ও আমাদের নেক আমল তথা ভালো কাজগুলো কবুল করুন।
আসলে ঈদ তো তার জন্য যিনি প্রকৃতভাবে মুত্তাকী হয়েছে। নিজের গুনাহ মুক্ত করিয়ে জান্নাতীদের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। সাহাবাদের যুগে ঈদের দিনেও তাদের কান্নাকাটি চলতেই থাকতো। যেমন এক ঈদের দিন হযরত আবু হোরায়রা (রা.) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.) এর ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন যে, মুসলিম বিশ্বের রাজাধিরাজ সৈয়্যদেনা উমর ফারুক (রা.) কান্নাকাটি করছেন। হযরত আবু হোরায়রা (রা.) ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আমিরুল মু’মিনিন! আজ ঈদের দিন। লোকেরা আনন্দোল্লাসে মেতে আছে, অথচ আপনি ঘরে দরজা বন্ধ করে কান্নাকাটি করছেন, এর হেকমত কী?’ এবার উমর ফারুক (রা.) জবাব দিলেন, ‘আনন্দিত লোকেরা যদি জানতো, তবে এমনটা করতো না’। এটা বলতে বলতে তিনি পুনরায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এবং বলতে লাগলেন, “তাদের (রমজানের রোযা, নামায, ইবাদাত, রিয়াজত) যদি আল্লাহ তায়ালা কবুল করে থাকেন, তবে তাদের আনন্দ উদযাপনে দোষের কিছু নাই। কিন্তু এর বিপরীত হলে আনন্দ উদযাপন না করা উচিৎ। আমি তো নিশ্চিত না যে, আমার ইবাদত-রিয়াজত কবুল হয়েছে কিনা? (আর এজন্যেই আমি কাঁদছি)”।
আবার এক ঈদের দিনে হযরত আলী (রা.) শুকনো রুটি খাচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর খেদমতে এক আগন্তুক উপস্থিত হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আজ ঈদের দিন অথচ আপনি শুকনো রুটি খাচ্ছেন কেন? উত্তরে আলি (রা.) বললেন, “আজ ঈদের দিন তাদের জন্য, যাদের রোযা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে। যার পরিশ্রম সফল হয়েছে। যার গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়েছে। আজকের দিন, আগামী দিন এবং প্রত্যেক দিন আমাদের জন্য ঈদ হবে, যখন আমরা আল্লাহর নাফরমানি করবো না” (গুনিয়াতুত ত্বালেবিন)।
প্রত্যেকটি সাহাবী কতটুকু মুত্তাকী ছিলেন তা এগুলো থেকেই বোঝা যায়। অথচ আমরা ঈদের চাঁদ উঠার সাথে সাথেই আল্লাহর নাফরমানিতে ব্যস্ত হয়ে যাই। রাস্তায় রাস্তায় সাউন্ড সিস্টেম লাগিয়ে উচ্চস্বরে গান-বাজনা করে অথবা কেউ কেউ মদ্যপান করে কাটিয়ে দেই। অথচ রমজান মাসে এসেছিলই আমাদেরকে মুত্তাকী বানানোর জন্য।
সারা মাস রোজা রাখার পর ঈদগাহের ময়দানে মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার নিতে যায়।একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পুরস্কারই হচ্ছে আল্লাহর কাছ থেকে গুনাহ মাফ করিয়ে জান্নাতের জন্য নিজের নাম কবুল করিয়ে নেওয়া।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ “মহান আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, মানব সন্তানের যাবতীয় কাজ তার নিজের জন্য। কিন্তু সিয়াম (রোজা/রোযা), এটা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দিব”। সে মহান সত্তার শপথ, যার হাতের মুঠোয় মুহাম্মাদের জীবন! নিশ্চয়ই সিয়াম (রোজা/রোযা) পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে কস্তুরীর সুগন্ধির চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৫৭১, ইসলামীক সেন্টার ২৫৭০)
তাই আমরা গুনাহ মুক্ত জিন্দেগি অতিবাহিত করার জন্য আল্লাহর কাছে তৌফিক কামনা করি। ঈদের দিনের করণীয় কিছু বিষয়, যা সুন্নাত হিসেবে সাব্যস্ত-
(১) প্রত্যুষে উঠে মিসওয়াক করা।
(২) উত্তমরূপে গোসল করা।
(৩) সুগন্ধি ব্যবহার করা।
(৪) চোখে সুরমা লাগানো।
(৫) পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা।
(৬) যত শিগ্রই সম্ভব ঈদগাহে যাওয়া।
(৭) সামার্থনুযায়ী উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করে নিজে, পরিবার, দারিদ্র ও প্রতিবেশীদের খাওয়ানো।
(৮) ঈদগাহে যাবার পূর্বে মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া।
(৯) ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই সদকায়ে ফিতর আদায় করা।
(১০) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া এবং দুটি ভিন্নপথ দিয়ে যাওয়া-আসা।
(১১) আবহাওয়া ঠিক থাকলে খোলা ময়দানে ঈদের জামাত করা।
(১২) ঈদগাহে যাবার পথে নিম্নস্বরে তাকবীরে তাশরিক পড়া। সর্বোপরি আল্লাহ এবং তাঁর প্রিয় রাসুলের সন্তুষ্টি আদায়ের মানসে যাবতীয় গর্হিত কাজ থেকে বেঁচে থেকে দিনাতিপাত করা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করেন। আল্লাহর রেজামান্দিতেই প্রত্যেকের বাকি জিন্দেগি ও শেষ হোক।
আমিন